কয়েকটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন
শামীমা বিনতে রহমান[/si]
------------------------------------------------------------------------
একাত্তরে অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে পাকিস্তান সেনা শাসকরা এ দেশীয় দোসরদের সহায়তায় বাঙালী জাতির জাতিগত বৈশিষ্ট ও মর্যাদাকে গুড়িয়ে দেওয়ার জন্য যুদ্ধাস্ত্র হিসেবে গণধর্ষণ চালালেও আজ পর্যন্ত তাদেরকে বিচারের আওতায় আনা সম্ভব হয়নি। যদিও জেনেভা কনভেনশান ১৯৪৯, রোম চুক্তি ১৯৯৮ এবং স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে প্রণীত দলাল আইন, ১৯৭২ এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইবুনাল) আইন, ১৯৭৩ অনুযায়ী ওই গণধর্ষণের ঘটনাকে যুদ্ধাপরাধ এবং অভিযুক্তদের চিহ্নিত করা হয়েছে।
বিশ্লেষক-গবেষকদের মতে, যুদ্ধাপরাধীদের বিষয়ে যুদ্ধোত্তর সরকারের রাষ্ট্রীয় শৈথিল্য, আন্তর্জাতিক চাপ এবং পরবর্তী সময়ে ধারাবাহিকভাবে এ দেশীয় যুদ্ধাপরাধীদের রাজনৈতিক ও সামাজিক পুনর্বাসন বিচার না হওয়ার জন্য দায়ী। পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার কারণেই ১৯৯২ সালে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি দেশব্যাপি ব্যাপক গণজোয়ার সৃষ্টি করলেও সরকারকে বিশেষ ট্রাইবুন্যাল গঠনে বাধ্য করা সম্ভব হয়নি। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক একটি মন্ত্রণালয় গঠন করলেও তারা এই মুহূর্তে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করার কথা ভাবছেন না। প্রতিমন্ত্রি রেদওয়ান আহমেদ ভোরের কাগজকে বলেন, ”সরকার এই মুহূর্তে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রসঙ্গে ভাবছে না, আর এ বিষয়ক প্রয়োজনীয় তথ্য প্রমাণাদিও মন্ত্রণালয়ে নেই।” যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে কর্মরত গবেষক, কর্মীদের মতে, বর্তমানে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য দুটি পথ খোলা রয়েছে।
এক. ১৯৭৩ সালে প্রণীত আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইবুনাল) আইনের মাধ্যমে সরকারকে বিশেষ ট্রাইবুনাল গঠনে বাধ্য করা।
দুই. সদ্য গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে বিচারের দাবিতে বিশ্বে জনমত তৈরি করা।
জাতিসংঘের প্রিপারেটরি কমিশন কর্তৃক জুলাই ২০০০ সালে প্রণীত আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে প্রয়োগের জন্য আইনি ধারা ৭(১) (জি)-১, ধর্ষণের মাধ্যমে সংঘটিত অপরাধ, ৭(১) (জি)-২, যৌন দাসীতে পরিণতকারণের মাধ্যমে সংঘটিত অপরাধ এবং ৭(১) (জি)-৬, যৌন নির্যাতনের মাধ্যমে সংঘটিত অপরাধ অনুযায়ী এবং ৭৩ সালে প্রণীত আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন ও হামুদুর রহমান কমিশন, পাকিস্তান জেনারেল তাজাম্মেল হোসেন মালিক প্রদত্ত পাকিস্তানি ডিফেন্স জার্নালে প্রকাশিত সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে ৭১-এ গণধর্ষণের দায়ে সে সময়কার প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক জেনারেল টিক্কা খান, খসড়া প্রণয়নকারী হিসেবে জেনারেল খাদিম হোসেন রাজা, জেনারেল রাও ফরমান আলী, সহায়তাদানকারী চিফ হিসেবে হামিদ খান, প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার এস জি এম পীরজাদা, মেজর জেনারেল মিঠাটা খান, জেনারেল ইফতেখার জানজুয়া, জেনারেল নিয়াজীর বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে। রাজাকার-শান্তিবাহিনীর পরিকল্পনাকারী হিসেবে রাও ফরমান আলী এবং পুরো পরিকল্পনার অনুমোদন দান ও সম্পৃক্ততার দায়ে ইয়াহিয়া খান ও জুলফিকার আলী ভুট্টোর বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে। ওয়ার ক্রাইমস ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি তাদের সা¤প্রতিক গবেষণায় এর বাইরে আরো ৬৩ জন সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট অভিযোগ এনেছে। অন্যদিকে ২ সেপ্টেম্বর ১৯৭১ এর দি ঢাকা গেজেটের তথ্যানুযায়ী, লে.জে. টিক্কা খান ১৯৭১ সালের জুলাই পূর্ব পাকিস্তান রাজাকার অর্ডিনেন্স জারি করেন এবং ৯ই এপ্রিল ৭১-এ গোলাম আযম ও নুরুল আমিনের নেতৃত্বে ১৪০ সদস্যবিশিষ্ট শান্তি কমিটি গঠন করা হয়। সংশিষ্ট গবেষকদের মতে, এসব তথ্যের ভিত্তিতে পাকিস্তানি ও এ দেশীয় যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে যথেষ্ট প্রমাণ দাঁড় করানো যায়।
১৯৭১-৭২ সালের সংবাদপত্র, বাংলাদেশ সরকারের গেজেট ১৯৭২-৭৩ এবং সংশিষ্ট গবেষণা গ্রন্থ সূত্রে জানা যায়, পাকিস্তানি ও এদেশীয় যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করার জন্য সে সময়কার সরকার ১০ জানুয়ারী ১৯৭২- এ দালাল আইন এবং ১৯৭৩-এ আন্তর্জাতিক অপরাধ আইন প্রণয়ন করে। বিচারের উদ্দেশ্যে শান্তি কমিটি, রাজাকার আল বদর, আল শামস বাহিনীর ৩৭ হাজার দালালদের চিহ্নিত করা হয়েছিল, যাদের অধিকাংশের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ ছিল। এই আইন অনুযায়ী ১৩ ই নভেম্বর ১৯৭২ সালে পাকিস্তান গভর্নর ডা. মালেকের বিচার শুরু হয়। ১৯ নভেম্বর তার যাবজ্জীবন কারাদন্ড হয়। কিন্তু এরপরই সাধারণ ক্ষমা ঘোষিত হয়। ওই ঘোষণার পর ৩৭ হাজার দালালের মধ্যে ২৬ হাজারকে মুক্তি দেয়া হয়। অবশিষ্ট ১১ হাজার দালাল ৭৫-এর পটপরিবর্তনের পর জিয়া সরকার দ্বারা কারাগার থেকে মুক্ত হয় এবং রাজনৈতিকভাবে পুনর্বাসিত হতে থাকে। একই ঘটনা ঘটে পাকিস্তান যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষেত্রেও। ৭২ এর জুলাই পর্যন্ত ৫০০ জনকে যুদ্ধাপরাধী ঘোষণা করা হয়। এরপর সেই সংখ্যা কমিয়ে ২০০ করা হয়। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উত্থাপনের কাজও চলে। কিন্তু তার কোনো কাগজপত্র পরবর্তী সময়ে খঁজে পাওয়া যায়নি। যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ সংগ্রহ গবেষণার কাজে দায়িত্ব পালনকারী সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, ৭২-৭৩ এ কয়েকট্রাক যুদ্ধাপরাধীর অভিযোগের দলিলপত্র স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আনা হয়েছিল, কিন্তু পরবর্তী সময়ে এই কাজ আর এগোয়নি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষক আবু মোঃ দেলোয়ার হোসেন তার “পাকিস্তান-বাংলাদেশ সম্পর্ক” গবেষণার আলোকে ভোরের কাগজে বলেন, ওই সময়ে মুজিব সরকার এ দেশীয় দালাল এবং পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে না পারার কারণ ছিল দুটি। একটি ছিল আন্তর্জাতিক চাপ। যার মধ্যে অন্যতম আমেরিকা ও আমেরিকার সমর্থনপুষ্ট রাষ্ট্র ও সংস্থাগুলোর অর্থ সহযোগিতা না করার চাপ। অপরটি এদেশের রাজনীতি ও বুদ্ধিজীবীদের চাপ। মাওলানা ভাসানী, মেজর জলিলরা যেমন বিরোধিতা করেছিলেন, তেমনি বিরোধিতা করেছিলেন আবুল ফজলরাও।
ধর্ষণের দায়ে অভিযুক্ত যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রসঙ্গে
দেশীয় ও আন্তর্জাতিক স্বার্থ সংশিষ্ট হিসাব-নিকাশ বিগত সময়ে কাজ করে আসলেও
বর্তমানে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ৭৩-এর আইন অনুযায়ী দাবি করেন আইন ও সালিস
কেন্দ্রের নির্বাহী প্রধান সুলতানা কামাল, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক ও ঘাতক
দালাল নির্মূল কমিটি নেতা শাহরিয়ার কবির। তাদের মতে, ৭৩-এর আইন অনুযায়ী
ট্রাইব্যুনাল গঠন করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে সরকারকে বাধ্য করা দরকার। যেমন,
১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অভিযুক্ত জার্মানি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হয়েছিল
নুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে।
অপরদিকে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সহায়তায় রুয়ান্ডার (১৯৯৪) এবং সাবেক
যুগোস্লাভিয়া (১৯৯২) ট্রাইব্যুনাল গঠনের মাধ্যমে বিচার হওয়ার উদাহরণ টেনে ওয়ার
ক্রাইমস ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটির আহবায়ক ডা. এম এ হাসান বলেন, যদিও
আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে অতীত অপরাধের কোনো বিচার কার্যই করার বিধান নেই, তবুও
আন্তর্জাতিক জনমত সৃষ্টি করে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের মাধ্যমে যুদ্ধাপরাধীদের
বিচার সম্ভব এবং সেই প্রক্রিয়াতেই আমরা এগুবার চেষ্টা করছি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক মেঘনা গুহ ঠাকুরতা বলেন, আন্তর্জাতিকভাবে বিচারের বিষয়টা আন্তর্জাতিক রাজনীতিরই অংশ। সেক্ষেত্রে আমেরিকা, ব্রিটেনসহ প্রভাব সৃষ্টিকারী মূল লবিকে আমাদের প্রভাবিত করতে হবে এবং এরপরই আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে বিচার প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে হবে।
[sb]শামীমা বিনতে রহমান